
ঝরনার সৌন্দর্য উপভোগ করার সবচেয়ে ভালো সময় হলো বর্ষাকাল শেষ হওয়ার পর পর। এ সময় পানির প্রবাহ ভাল থাকে। কিন্তু তেমন বিপদজনক নয়। যদি সেই ঝরনার অবস্থান হয় কোনো দুর্গম এলাকার ভেতরে, তা হলে তো কথাই নেই। এমনই একটি ঝরনার খোঁজ পেয়ে গেলাম খাগড়াছড়িতে। সিজুক ঝরনা।
খাগড়াছড়িতে গিয়ে পৌঁছাতে আমাদের সকাল হয়ে গেল। এখান থেকে আমরা চলে গেলাম দীঘিনালায়। শহর থেকে লোকাল বাসে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা, উঁচুনিচু প্রায় এক ঘণ্টার রাস্তা। দীঘিনালা বাজারে পৌঁছে সিজুক ঝরনা যাওয়ার জন্য পথের খোঁজ করলাম। দুর্গম এই এলাকায় পর্যটকদের আনাগোনা খুবই কম। জানতে পারলাম, সিজুক ঝরনায় যেতে হলে আমাদের মোটরসাইকেলে প্রথমে নন্দরাম যেতে হবে। তারপর হাঁটার পথ। দীঘিনালা বাজারে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল পাওয়া যায়। মোটরসাইকেলচালকই আমাদের গাইড।
বাইক রওনা দিল নন্দরামের দিকে। পাহাড়ি রাস্তায় চলাচলের মজাই অন্য রকম। চারপাশে পাহাড়ি সবুজ। মাঝে পেঁচানো পাকা রাস্তা। রাস্তায় সেনাবাহিনীর চেকপোস্টে নাম লেখাতে হয়। সেখান থেকে আমাদের সময় বেঁধে দেওয়া হলো—সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে ফিরে আসতে হবে। কারণ, পাহাড়ি পথে সন্ধ্যার পর চলাচল করা নিষেধ। আমাদের এই ভ্রমণ এখন যেন কোনো অভিযান।
নন্দরাম পৌঁছে আমরা ডান দিক দিয়ে ঢুকে গেলাম সিজুক ঝরনার দিকে, পাহাড়ি কাঁচা রাস্তায়। স্থানীয় লোকজন এই ঝরনাকে ‘দুই বোন ঝরনা’ হিসেবে ডাকে। কারণ, কিছুদিন আগে দুই বোন এই ঝরনার ওপর থেকে পড়ে মারা যায়। নন্দরামের আগে আরেকটি ঝরনা পড়ে। কিন্তু সময়ের অভাবে সে পথে আমাদের যাওয়া হলো না।
দুপুরের রোদ মাথায় নিয়ে এগোচ্ছি আমরা ঝরনার দিকে। আর এ কারণেই বোধ হয় ক্লান্তির পরিমাণ একটু বেশি। এই দিকটায় জনবসতি নেই বললেই চলে। পাহাড়ের গায়ে মানুষ হেঁটে তৈরি করেছে চিকন রাস্তা। নিচ দিয়ে প্রবাহিত দূর থেকে আসা ঝরনার পানি। চোখ যেদিকে যায়, পাহাড় আর শরতের পরিষ্কার নীল আকাশ। আশপাশে কোনো শব্দ নেই। এভাবে প্রায় দেড় ঘণ্টা হাঁটার পর পৌঁছালাম আমরা পানির সামনে।
এবার আমাদের হাঁটতে হবে পানির মধ্য দিয়ে। শুরু করলাম হাঁটা। বরফ শীতল পানির প্রবাহটা সিজুক ঝরনা থেকে এসেছে। পাহাড়ি মানুষগুলোর কাছে আমাদের এই ঝরনার কাছে আসাটা নিছক পাগলামি। তাদের কথা, ঝরনা আবার দেখার কী জিনিস? পানির মধ্যে হাঁটি। পায়ে মাঝেমধ্যে আটকে যাচ্ছে গাছের শিকড় ও পাথর। আর পোকার কামড় তো সঙ্গে রয়েছে। এভাবে প্রায় ৪০ মিনিট রাস্তা হাঁটার পর পৌঁছালাম আমরা সেই সিজুক ঝরনার কাছে। পাহাড়ের এক কোণায় ওপর থেকে নেমে এসেছে এই ঝরনা। পানির স্রোত অনেক বেশি। আর এ কারণেই ঝরনার কাছে যাওয়া যায় না। শীতের সময় এর পানি নাকি একদম কমে যায়। বেশ কিছুক্ষণ সময় পার করার পর আবার ফিরে আসা। ফেরার পথটা একটু কষ্টের। কারণ, একটা পাহাড়ে উঠতে হয়।
এই পথের মূল সমস্যা হলো জোঁক। তবে ঝরনা, পাহাড়ের সবুজ আর আকাশের নীলের যে অপূর্ব রূপ তার জন্য তা মেনে নেওয়া যায়। আবার ফিরে চললাম দীঘিনালার পথে। অভিযান সার্থক বলা যাবে—ঝরনা দেখেছি আবার ঠিক সময়ে ফিরতেও পেরেছি। দীঘিনালা থেকে চাঁদের গাড়িতে করে আমরা চলে এলাম খাগড়াছড়ি। সেখান থেকে আবার যান্ত্রিক জীবনের নগর ঢাকায়।
জেনে নিন
ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি যাওয়ার সরাসরি বাস রয়েছে। খাগড়াছড়ি শহরে পৌঁছে বাসে করে যেতে হবে দীঘিনালা। তারপর মোটরসাইকেল আর হেঁটে সিজুক যেতে হবে। দীঘিনালা পৌঁছে সহজেই মোটরসাইকেল ও গাইড পেয়ে যাবেন। তবে সিজুকের আশপাশে বা দীঘিনালায় থাকার ভালো ব্যবস্থা নেই। থাকাতে চাইলে খাগড়াছড়ি শহরে হোটেল পাবেন।


