বৃত্তের বাইরে দাঁড়ানো আনুশেহ্ ...

বনানীর ৫ নম্বর সড়কে যাত্রার বড়সড় শোরুম। ঘরের এক পাশে রিকশা পেইন্টিংয়ের বর্ণিল আবহ। সেখানে চড়া রঙে ফুল পাখির নক্শা আঁঁকা। দেখেই ‘এখন বোধ হয় ফুল ঝরানোর পালা’ গানটি মনে পড়ে যায়। বসে আছি এই গানের শিল্পীর অপেক্ষায়। এর মধ্যেই তিনি এলেন। বসতে বসতে বললেন, ‘আপাতত ডুব মেরে আছি।’ এরপর মুখে এক টুকরো হাসির রেখা ছড়িয়ে দিলেন কণ্ঠশিল্পী আনুশেহ্ আনাদিল। কথায় কথায় জানা গেল, নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যাত্রাকে ঘিরেই এখন ব্যস্ত দিন কাটছে তাঁর। তবে গানকেও ভুলে যাননি। এ বছর ২১ ফেব্রুয়ারি নিজের প্রথম একক অ্যালবাম রাই ইন্টারনেটে প্রকাশ করেছেন তিনি। এছাড়া ইন্টারনেটেরাইয়ের গানগুলো শুনতে চাইলে ভিজিট করুন www.anushehanadil.com
‘এখন চারপাশে এত কর্পোরেট পুঁজি, সবকিছুর পেছনেই বড় বড় কোম্পানির লোগো। আমাদের মুখ বিজ্ঞাপনের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে— এসব আমার ভালো লাগে না। তাই কোন প্রতিষ্ঠানের ব্যনারে না গিয়ে গানগুলো ইন্টারনেটে ছেড়েছি। মানুষের জন্য গান করি। চাই যে, মানুষ যেন ইচ্ছা করলেই গানগুলো শুনতে পারে।’ —ইন্টারনেটে অ্যালবাম প্রকাশ নিয়ে আনুশেহর সোজাসাপটা কথা। আরো জানালেন, কেউ চাইলেই বিনে পয়সায় ডাউনলোড করতে পারবেন রাই। তবে কেউ যদি খুশি হয়ে টাকা দিতে চান— তার সুযোগও আছে।
‘রাই ইন্টারনেটে ছাড়ার তিন সপ্তাহের মধ্যে জমা হয়েছে এক হাজার ডলার।’ —আনুশেহ যখন এই তথ্যটি দিলেন, তাঁর চোখেমুখে তখন খুশির ছাপ স্পষ্ট। সেই খুশিতেই যেন কণ্ঠে শোনা গেল, ‘তরুণরা আমার এই উদ্যোগ পছন্দ করেছেন। দারুণ সাড়া পাচ্ছি।’
রাইয়ে মোট গান ১১টি। এর মধ্যে ৯টিই আনুশেহর নিজের লেখা। বাকি ২টি লিখেছিলেন চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ।
ধীরে ধীরে ঘনিভূত হচ্ছে আড্ডা। যাত্রার বড়সড় ঘরটিতে এখন নানা কথার ফুলঝুরি । সেসব কথার ভিড় পেরিয়ে আবারও ফিরে এলাম রাইয়ের প্রসঙ্গে— ‘এতদিনে প্রথম একক অ্যালবাম...।’ কথা শেষ হলো না। মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন, ‘সে এক ঘটনা। হয়তো অনেকের বিশ্বাস হবে না। আমি তো বাউল-সাধুদের আখড়ায় আখড়ায় ঘুরছি অনেকদিন থেকেই। এমনই এক আখড়া হুমায়ুন সাধুর। তিন বছর আগে সেখানে গান করতে গিয়েছিলাম। হঠাৎ একজন লোক, আমি তাঁকে চিনি না, আমায় বললেন, অনেক পুরুষ তো আসল-গেল, নারীর কথা কেউ শুনল না। তুই নারীর কথা বল...। অপরিচিত ওই ব্যক্তির কথায় কেমন যেন একটা ঘোর ছিল। ভাবনাটা তখন থেকেই। রাইয়ের প্রতিটি গানে নারী আছে অনেক রূপে। কখনও সে রাধা, কখনও আবার সে বৃষ্টি হয়ে ঝরে।’
একটানা অনেকক্ষণ কথার তোড়ে এবার একটু দম নিলেন ভেঙে যাওয়া ব্যান্ড বাংলার এই সদস্য। ‘আমিও তো সাঁই, না কি বলেন! ভাবলাম, নিজেকে এবার একটু চান্স দেই।’ যেন মজার কিছু বলে ফেলেছেন, এমনভাবে হেসে উঠলেন আনুশেহ। তবে দ্রুতই সামলে নিলেন সেই হাসি। এরপর যে খুব কঠিন কথা বলবেন, এটা হয়তো তারই প্রস্তুতি। ‘আমরা সবাই এখন হিপোক্রেসির মধ্যে আছি। আমাকে আমার হিপোক্রেসি ছাড়তে হবে, আপনাকে আপনারটা। রাইয়ের অধিকাংশ গানে ফোক টিউন আছে। তবে আমি এর সঙ্গে নাগরিক সুরও মিশিয়েছি। আমার বেড়ে ওঠা ঢাকায়। আমি তো আর বাউল-বয়াতির মত করে ফোক গান করতে পারব না, করা উচিতও নয়। কারণ, আমি তাঁদের মত জীবন যাপন করি না। তাই ফোকের সঙ্গে নাগরিক সুরের মিশেল দিয়েছি। গানের ক্ষেত্রে আমি হিপোক্রেসি করতে চাইনি।’
আনুশেহ কথা বলছেন । কথাগুলো অনেকদিনই হয়তো জমাট হয়েছিল তাঁর বুকে । কিন্তু কথারও একসময় লাগাম টানতে হয়। তাই একটু একটু করে যখন গুটিয়ে আনছি আড্ডা, তখনও তিনি বললেন, ‘আমার বাঁধাধরা কিছু ভালো লাগে না। সবসময়ই আমি বৃত্তের বাইরে থাকতে চাই।’
এখানে শেষ খবরটি জানিয়ে রাখি— সামনের মাসেই রাই অ্যালবামটি সিডি আকারে প্রকাশ করবেন আনুশেহ। ইন্টারনেটেরাইয়ের গানগুলো শুনতে চাইলে ভিজিট করুন www.anushehanadil.com


