
অথৈই জলের অতলে...
প্রকৃতিকে একটু কাছে থেকে দেখতে কার না স্বাদ জাগে। আর তাই একটু অবসর পেলেই মানুষ ছুটে যায় কোন সবুজ, নদী অথবা সমুদ্রের কাছে। বাংলাদেশে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায় একটিমাত্র সমুদ্র সৈকত, যেখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত একসঙ্গে দেখা যায়। সমুদ্রের বুক চিরে সূর্য ওঠা আর হারিয়ে যাওয়ার দৃশ্য অবলোকন করা নিসন্দেহে ভাগ্যের ব্যাপার। ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ সমুদ্র সৈকত বিশ্বের মানচিত্রে সর্বশেষ সমুদ্র সৈকত। এখানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়। পর্যটন বিশ্বের অবারিত দিগন্তে তাই কুয়াকাটা অনন্য-অসাধারণ।
অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি কুয়াকাটাকে বলা হয় সাগর কন্যা। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষাসহ সব ঋতুতেই মৌসুমী পাখিদের কলরবে মুখরিত থাকে এ সমুদ্র সৈকত। একমাত্র কুয়াকাটা পর্যটন কেন্দ্রে এসেই প্রকৃতির নানা রূপ উপভোগ করা সম্ভব। আর তাইতো দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভ্রমণ পিপাসুরা বছরের বিভিন্ন ঋতুতে বার বার ছুটে আসে কুয়াকাটায়। কৃত্রিমতার কোন ছাপ নেই এখানে। যে কারণেই পর্যটকরা কুয়াকাটায় এসে প্রকৃতির নিয়মের সঙ্গে নিজের মনকে একাকার করে প্রকৃতির স্বাদ নিজ উপলব্ধিতে আত্মস্থ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে।
কুয়াকাটায় সূর্যোদয় দেখার জন্য ঝাউবনে যাওয়াই ভালো। সেখান থেকেই সূর্যাস্ত ভালো দেখা যায়, সমুদ্রের বুক চিরে কিভাবে সূর্য ওঠে তা দেখার জন্য আপনার মতো আরও অনেক লোকই আপনার আগে চলে যাবে সেখানে সন্দেহ নেই। সকালবেলা হেঁটে হেঁটে ঝাউবনে যেতে সময় লাগবে ২০ মিনিট। আর ভ্যানে বা রিকশায় গেলে লাগবে ১০ মিনিট। সেখানে সারি সারি গাছ নিঃসন্দেহে আপনার ভালো লাগবে।
এ বনটি সরকার বনায়ন পরিকল্পনার অধীনে তৈরি করেছে। কারও কারও কাছে সূর্যোদয়ের চেয়ে সূর্যাস্তের দৃশ্যটা বোধহয় বেশি ভালো লাগে। সমুদ্রের বুকে সূর্য ডুবে যাওয়ার সময় রংয়ের পরিবর্তনটা আপনি স্পষ্টই দেখতে পাবেন। আর সৈকতে গেলে দেখতে পাবেন সারি সারি কাঠের চেয়ার আর রোদ থেকে রক্ষা পাওয়ার ছাতা। এসব চেয়ার ভাড়া পাওয়া যায় ঘণ্টা হিসেবে। সমুদ্রের গর্জন দিনের বেলা সাধারণত আশপাশের শব্দের কারণে তেমন শোনা না গেলেও তার ভয়ঙ্কর রূপ বোঝা যায় রাতে। যদি রাতে সমুদ্রের গর্জন শুনতে চান তবে অবশ্যই যেতে পারেন সেখানে। নিরাপত্তাজনিত কোন ভয় নেই সেখানে। তবে সাবধানে থাকাই ভালো।
সৈকতের কাছাকাছি কোন হোটেলে থাকলে সমুদ্রের গর্জন হোটেল থেকেও শোনা যেতে পারে। দর্শনার্থীদের জন্য কুয়াকাটা সৈকতে আরও আছে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল ও ঘোড়া। ভাড়া সাধারণত দূরত্ব ও সময় অনুযায়ী হয়। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের আশপাশে বেশ কয়েকটি পিকনিক স্পট রয়েছে। সেগুলিতে রান্না করার সব ব্যবস্থা আছে। চুলা, খড়ি, হাঁড়ি-পাতিল থেকে বাবুর্চি পর্যন্ত। কুয়াকাটার আশপাশের বেশ কয়েকটি চর আছে। সেগুলো দেখতে আপনি যেতে পারেন স্পিডবোট ও ট্রলার কিংবা ইঞ্জিন চালিত বড় নৌকায় করে। স্পিডবোট ভাড়া ২ হাজার টাকা ও ট্রলার ভাড়া প্রায় ১৫শ' টাকা। তবে দূরত্ব ও সময়ের সঙ্গে টাকার পরিমাণ কমবেশি হতে পারে।
একই স্থানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের দৃশ্য অবলোকন করা ছাড়াও এখানে রয়েছে রাখাইন সমপ্রদায়ের বিভিন্ন কীর্তি। রয়েছে প্রায় ২০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্য শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহারে প্রতিষ্ঠিত 'গৌতম বুদ্ধের' বিশাল আকৃতির মূর্তিসহ শ্বেত পাথরের নির্মিত ছোট-বড় অসংখ্য মূর্তি। এই ফাঁকে আরেকটা বিষয় জানিয়ে দিই, আরাকান রাজ্য থেকে বিতারিত হয়ে আসা রাখাইন সমপ্রদায়ের লোকরা তাদের রাজা মং'র নেতৃত্বে সাগর পাড়ি দিয়ে প্রথমে চট্টগ্রাম এবং পরে পটুয়াখালীর এ জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায় তাদের বসতি স্থাপন করেন। নিজস্ব ঐতিহ্য ও কৃষ্টে গড়ে তোলেন নিজেদের আবাসস্থল। তৎকালীন রাজা মং রাখাইন সমপ্রদায়ের লোকদের সাগরের লবণাক্ত পানি যাতে ব্যবহার করতে না হয় সে লক্ষ্যে তিনি সমুদ্র সৈকতের কাছেই মিষ্টি পানি ব্যবহারের জন্য ২টি 'কুয়া' খনন করে। এ কুয়ার জন্যেই ওই এলাকার নাম হয় 'কুয়াকাটা'।
পরে রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকরা কুয়াকাটাসহ খেপুপাড়া, কলাপাড়া, গলাচিপা, রাঙ্গাবালী ও তালতলী এলাকার ঝোপ-ঝাড় পরিষ্কার করে নিজেদের পদ্ধতিতে চাষাবাদ ও বসতি শুরু করে। পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকার এ সম্প্রদায়ের জায়গা-জমির ওপর কর ধার্য করতে চাইলে তারা ওই কর দিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। এর দীর্ঘ সময় পর কালাউ মাদবার এবং খেপাউ মাদবার নামে দুই ভাই, দুই পাড়া প্রধান ছিল। তারা ব্রিটিশ সরকারকে কর দিতে সম্মতি জ্ঞাপন করে। এদের নাম অনুসারেই নামকরণ হয় কলাপাড়া ও খেপুপাড়া। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম প্রান্তে নদী পার হলেই সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। এরই নাম ফাতরার বন। এ জায়গাটি অবিকল সুন্দরবনের মতো হলেও হিংস্র কোন বন্যপ্রাণী নেই বললেই চলে। বন মোরগ, বানর আর বিভিন্ন রকম পাখিই এ বনে বেশি দেখা যায়। খুবই কম পরিমাণে দেখা মেলে বন্য শুকরের। কুয়াকাটা থেকে ফাতরার বনে যেতে হলে লাগবে ইঞ্জিন বোট।
কুয়াকাটায় সীমিত সংখ্যক দোকান আছে আপনি আপনার প্রয়োজনীয় ও সৌখিন জিনিসপত্র ক্রয় করতে পারবেন সেসব দোকান থেকে। শামুক-ঝিনুকের তৈরি বিভিন্ন সৌখিন দ্রব্যাদি, রাখাইনদের তৈরি চাদর, কাপড়, ওড়না ইত্যাদিও পাবেন একটু কম দামে। কুয়াকাটায় শুঁটকি পল্লী থাকায় এখানে অনেক কম দামে বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের শুঁটকি পাবেন।
কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বেশ কয়েকটি বাস এখন সরাসরি কুয়াকাটা যায়। এর মধ্যে সাকুরা পরিবহন ও বিআরটিসি। আপনি এসব বাসে গেলে আপনাকে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে ২০০ মিটার দূরে নামিয়ে দেবে। আপনি চাইলে ঢাকা থেকে খুলনা হয়ে যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে খুলনায় আসার অনেক ভালো বাস পাওয়া যাবে। আর উত্তরবঙ্গ থেকে আসতে চাইলে সৈয়দপুর থেকে খুলনা পর্যন্ত রূপসা অথবা সীমান্ত আন্তঃনগর ট্রেনে করে আসতে পারবেন।
কোথায় থাকবেন
কুয়াকাটা বিচের পাশের বাঁধের রাস্তার দুধারে এবং মেইন রোডের আশপাশে অনেক হোটেল, মোটেল ও বাংলো পাবেন। আপনার সুবিধামতো যে কোন একটিতে উঠতে পারেন। এসব হোটেলে ও মোটেলে ভাড়া ১৫০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়াও এখানে দুটি সরকারি ডাকবাংলো আছে। একটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের অন্যটি এলজিইডি মন্ত্রাণালয়ের অধীনে। সরকারি কর্মকর্তারা আগে থেকে যোগাযোগ করলে পেয়েও যেতে পারেন এই দুটোর একটি।


