banglateinmant

Traveling : Bangla Tourism

নাফাখুমের পথে

প্রকৃতির নিয়মে সৃষ্টি হয়েছে চমৎকার জলপ্রপাত। সূর্যের আলোয় যেখানে নিত্য খেলা করে বর্ণিল রংধনু। যার নাম নাফাখুম। আমাদের দেশের এত সুন্দর জলপ্রপাত সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি না। রেমাক্রি জলপ্রপাত নামেও এটা অনেকের কাছে পরিচিত। দারুণ এই অভিজ্ঞতা যে গন্তব্যে সেটি নাফাখুম জলপ্রপাত। সম্প্রতি সেখান থেকে ঘুরে এসে লিখেছেন_ শারফুল আলম

বেড়ানোটা আমাদের সবারই শখ। কিন্তু পড়াশোনা-কর্মজীবনের ব্যস্ততার জন্য ইচ্ছা থাকলেও সব সময় ভ্রমণে বের হতে পারি না। এবারে ঈদের ছুটির সঙ্গে বাড়তি চার দিনের ছুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম পাহাড় দর্শনে। খাগড়াছড়ি আর চট্টগ্রামে ঝটিকা সফর শেষে বান্দরবানের এই যাত্রায় আমার অন্য সঙ্গীরা হলো মিজানুর রহমান, শাহাদাত হোসেন অনিক, সামির মাহমুদ এবং নাইমুল বারী পাভেল।

১৮ নভেম্বর রাতে ঢাকা থেকে পাঁচজনের দল রওনা হই। খাগড়াছড়ি আর চট্টগ্রাম বেড়িয়ে এবার আমরা বান্দরবানের পথে। বান্দরবানে আগেও এসেছি। তবে এবার ভিন্ন এক জলপ্রপাতের খোঁজে এই অভিযাত্রী দল বেড়িয়েছে। বান্দরবানের স্থানীয় অনেকেই এখনো এই জলপ্রপাতের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেনি। বাসে বসে মুঠোফোনের কল্যাণে বান্দরবান শহরে পেঁৗছানোর আগেই নৃপেন আর জন আমাদের দুর্গম যাত্রাকে সহজ করে দিতে স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়।

বান্দরবান শহরে পেঁৗছে সরাসরি চলে যাই থানচি বাস স্ট্যান্ডে। প্রতিদিন এখান থেকে সকাল ১১টা ও দুপুর ১টা ৩০ মিনিট এবং ৩টায় থানচির উদ্দেশে বাস ছেড়ে যায়। আমরা ১টা ৩০ মিনিটে গাড়িতে উঠি। অনেক দিনের শখ পূরণে আমি, মিজান ভাই, সামির গাড়ির ছাদে বসে পাহাড় আর মেঘের লুকোচুরি উপভোগ করতে করতে উঁচু-নিচু অাঁকা-বাঁকা পথ পাড়ি দিচ্ছি। এ যেন সত্যি সত্যিই প্রকৃতির রোলার কোস্টার। প্রকৃতির সৃষ্টি সত্যিই বিস্ময়কর, না দেখলে তা বোঝার উপায় নেই। পথ চলতেই চোখে পড়ল মিলন ছড়ি, চিম্বুক পাহাড়, নীলগিরি, কেউকেড়াডং পথ, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাস্তা পিন্স ৬৯, বাঘাইছড়ি, রুমা, বালাঘাটসহ আরও অনেক অঞ্চল। রাস্তার দুই ধারে সাইনবোর্ডে শোভা পাচ্ছিল স্থানীয়দের নৃতাত্তি্বক পরিচয়। চিম্বুকে যাত্রা বিরতিতে আমরা সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ি। গাড়ি চলাচলের রাস্তা যখন শেষ তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। থানচিতে নেমে অপরিচিত অজানা এ জনপথ যেন আমাদের সবাইকে ভাবিয়ে তোলে। নৌকা দিয়ে নদী পার হয়ে এবার থানচি বাজারে আসতেই আমাদের অভ্যর্থনা জানালো দুনি ত্রিপুরা আর গিলাচন্দ্র ত্রিপুরা। নাফাখুমে ভ্রমণ করার জন্য স্থানীয় পুলিশ, বিডিআর ক্যাম্পে আমাদের নাম এন্ট্রি করা হয়। দোকানে বসেই রেমাক্রি বাজারে যাতায়াতের জন্য নৌকা রিজার্ভ করি। রাত্রের খাওয়া-দাওয়া শেষে পরের দিনের নাস্তা, দুপুরের খাবার দুই কান্দি কলা ও পাহাড়ি পেঁপে সরবরাহ করার জন্য হোটেলেই বলে রাখি। এবার রাতে ঘুমানোর জায়গা নিয়ে সবাই চিন্তিত। অবশেষে স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করে চেয়ারম্যানের গেস্ট হাউজে আমরা রুম ভাড়া করি। মারমা অধ্যুষিত এলাকায় মারমা পরিবারের অতিথি হতে পেরে আমরাও ভীষণ খুশি। জেনাম গম আর তার পরিবারের সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তির কুশল বিনিময় আমাদেরকে মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। সীমারের মতো ওনার একজন নাতি থাকায় আমাদের আদর যত্নের ঘাটতি ছিল না। আমরাও যে যার মতো ওনাকে নানু-দিদা, কিংবা দিদি বলে ডাকতে থাকি।

ক্ষণিকের পরিচয়ে তিনি জানতে চাইলেন আমরা কোথায় যাব? কে কি করছি, থানচি কেমন লাগছে আরো কত কী। যেন বহু দিনের পুরনো অতিথি তাদের ঘরে এসেছে।

থানচি থেকে রেমাক্রি: পাঁচজনের টিমে একজন বটবৃক্ষ মিজান ভাই, আমরা তাকে টাইম কিপার হিসাবেও চিনি। ভোর পাঁচটা বাজতেই সবাইকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিলেন। হোটেল থেকে আগে থেকেই অর্ডার করা খাবার নিয়ে আমরা নৌকায় উঠছি। একে তো পাহাড় তার ওপর নদী, শীত যেন আমাদের পেয়ে বসেছিল। নৌকা এগিয়ে চলছে আমরা একে একে দেখে চলছি ঢালু জায়গার লাঙল দিয়ে চাষাবাদ, তামাক চাষ, কাঠ কাটা, অাঁকা-বাঁকা মেঠোপথ বেয়ে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়ার দৃশ্য। এ জনপদের মানুষদের জীবনসংগ্রাম যে ভয়াবহ কঠিন তা বুঝতেও বাকি রইল না। বম পাড়া, ঝিন্না পাড়া, বাকলাই ঝরনা আর কত কী? উজান থেকে বেয়ে আসা পানির স্রোত এতই বেশি যে মাঝে মাঝে আমাদেরকে নৌকা থেকে নেমে পায়ে পথ চলতে হয়। এর পর আবার নৌকা। ৬ ঘণ্টার নৌকা ভ্রমণে এমন অন্তত পাঁচবার আমাদের নামতে হয়েছে। এরপর আবার হেডম্যান পাড়া, বোজিংপাড়া অতিক্রম করার পর হঠাৎ চোখে পড়ল নদীর মাঝখানে বড় বড় সব পাথর। রাজা পাথর দেবতার পাথর, হেডম্যান পাথর আশীষ এদিক-ওদিক করে সরু নৌকা ঠিকই পার করল পাথরের বাঁক দিয়ে। এরই মধ্যে প্রত্যেকেই কলা আর পেঁপে খেয়েছি একাধিকবার। সকাল গড়িয়ে দুপুর জানান দিচ্ছে এবার আমাদের খেতে হবে। নৌকায় বসে দুপুরের খাবার শেষ করতে না করতেই একটি পাড়ার দেখা মিলল। এ পাড়াটিই রেমাক্রি নামে বহুল পরিচিত।

রেমাক্রি টু নাফাখুম: নৌকা থেকে সিঁড়ি বেয়ে উপড়ে উঠতেই একটা সাইনবোর্ডে লিখা রেমাক্রি বাজার। এ বাজারে অনেক আদিবাসীরা বসবাস করে থাকেন যাদের আবার খাবার দোকান, ওষুধের দোকান বা রেস্ট হাউজ আছে। এমনি এক খাবার হোটেলে রাতের খাবারের অর্ডার করে স্থানীয় একজন গাইড নিয়ে এবার আমাদের পায়ে হাঁটা পথ শুরু। দুর্গম পাহাড় অতিক্রম করতেই আমরা অন্য এক নদীর কূল ঘেঁষে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। পায়ে হাঁটার রাস্তাতেও বাধ সাধলো নদী। এই একটি মাত্র নদী আমরা ৩-৩ বার পার হলাম। একবার হাঁটু-পানি, পরের বার কোমর পানি এবং শেষবার গলা পানি। আমাদের রাস্তা যেন শেষ হয় না। সবারই লক্ষ্য একটা কখন দেখব নাফাখুম জলপ্রপাত। হাঁটতে-হাঁটতে চোখে পড়ল ছোট বড় ঝরনা, মাছ ধরা, বন্য প্রাণী।

শুনতে কি পাও: শুনতে কি পাও এমন প্রশ্নের উত্তরে সবার চেষ্টা ঝরনা থেকে পানি পড়ার শব্দ শুনতে। এরপরও যেন হাটার রাস্তা শেষ হয় না। অবশেষে দেখা মিলল মাছের নামের সঙ্গে মিল করে নাম রাখা এই নাফামুখ জলপ্রপাতের। চারপাশ পাহাড় ঘেরা প্রায় ৩-৪ ফুট ওপর থেকে নিচে পানি বেয়ে পড়ছে। প্রকৃতির সৃষ্টি এই অপূর্ব দৃশ্য সত্যিই নয়নাভিরাম। আর এ জন্যই হয়তো বলে সৌন্দর্য নাকি ভয়ঙ্করও হয়। জলপ্রপাত দেখা মাত্র আমরা সবাই যে যার মতো করে ছবি তোলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। সিলেট বা খাগড়াছড়িতে অনেক ঝরনা দেখেছি কিন্তু এমন ঝরনা কোথায়ও দেখি নাই। স্থানীয় অনেকেই একে কানাডার নায়াগ্রা জলপ্রপাত হিসেবেও আখ্যায়িত করে থাকে। প্রায় দুই ঘণ্টা পর আবারও রেমাক্রির পথে যাত্রা শুরু করি। ভ্রমণ পিপাসুদের ভ্রমণ তৃষ্ণা মেটাতে পারে রেমাক্রির এই জলপ্রপাত। দুই পাশের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য দেখতে দেখতে আমরা ফিরে এলাম। জেনেছি নাফাখুমের পানি যেখান থেকে বেরিয়ে এসেছে তা আরও দুই দিনের পথ। সেখানেও আছে জলপ্রপাত। এর চেয়েও উঁচু। প্রায় ১০০ ফুট উঁচু থেকে পড়ে জলরাশি। তাজিনডং পেরিয়ে যেতে হয় সেখানে। বান্দরবানের এরকম রোমাঞ্চকর ও অপার সুন্দর জায়গাগুলো নিয়ে আমরা তো গর্ব করতেই পারি!

যেভাবে যাবেন: বাসে ঢাকা থেকে বান্দরবান। ভাড়া ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা। রাজধানীর ফকিরাপুল ও সায়েদাবাদ থেকে প্রতিদিন বান্দরবানের উদ্দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গাড়ি যাতায়াত করছে। বান্দরবান থেকে জিপে করে থানাচ। গাড়ি ভাড়া তিন হাজার টাকা, জনপ্রতি ভাড়া পড়বে দুইশত টাকা। থানাচ থেকে রেমাক্রি যেতে হবে নৌকায়। রেমাক্রি বাজারে পেঁৗছে সাথে সাথে প্রথমে নিজেদের থাকার জন্য হোটেল ঠিক করতে হবে। এবং রাতের খাবারের অর্ডার করতে হবে।

কোথায় থাকবেন: থানাচ, তিন্দু বা রেমাক্রি বাজারে কাঠের ঘরে থাকা যাবে। এ ছাড়াও গাইডের সহযোগিতায় আদিবাসী গ্রামেও থাকা যেতে পারে।

















নির্দেশ উপেক্ষাকারী পোশাক কারখানার মালিকদের বিরুদ্ধে বিজিএমইএ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে বলে মনে করেন কি?

Prothom alo Ittefaq
Songbad
Songbad daily destiny
daily suprovat bangladesh ctg
daily Azadi Daily Uttar Purba
Daily Khowai
shaptahik